হাসান শিরাজী: প্রতি বছর আমাদের দেশে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হচ্ছেন। কিন্তু চাকরির বাজারে গেলে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। নিয়োগদাতারা প্রায়ই আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা যোগ্য লোক পাচ্ছি না’, অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে বলছেনÑ ‘কোথাও চাকরি নেই’। এই যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, এর মূল কারণ কী?
কারণটি খুব সাধারণÑ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি। আমরা ক্লাসরুমে যা শিখছি, বাস্তব জীবনে তার অনেকটাই কাজে লাগছে না। এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসার কার্যকর উপায় হলো দেশে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো’ বা ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা। সহজ কথায়, এটি এমন একটি মানদণ্ড বা ফ্রেমওয়ার্ক, যা নিশ্চিত করবে একজন শিক্ষার্থী কোন স্তরের পড়াশোনা শেষ করে ঠিক কী কী কাজ করার দক্ষতা অর্জন করল। আর এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় ও বাধ্যতামূলক শর্ত হতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পরপর সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা।
তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা, অর্থনীতি কিংবা বিজ্ঞানের দুনিয়া এখন প্রতিদিন বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে পৃথিবী যেখানে রকেটের গতিতে ছুটছে, সেখানে আমাদের পাঠ্যবইগুলো পড়ে আছে ১০-১৫ বছর আগের পুরোনো ধ্যান-ধারণায়। ফলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা যখন সার্টিফিকেট হাতে কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন তারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তরুণদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। পুরোনো সিলেবাস মুখস্থ করে পাস করা যায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করা যায় না।
সরকার এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের এখনই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একটি কার্যকর এনকিউএফ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সিলেবাস হালনাগাদ বাধ্যতামূলক করা: শিক্ষা আইনে এমন একটি ধারা যুক্ত করতে হবে, যাতে প্রতি তিন বা পাঁচ বছর পরপর পাঠ্যক্রমের মূল্যায়ন ও পরিবর্তন আইনিভাবে বাধ্যতামূলক হয়। সিলেবাস পরিবর্তনের বিষয়টি যেন কোনোভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা কারও মর্জির ওপর নির্ভর না করে, বরং এটি যেন একটি স্বয়ংক্রিয় নিয়মের মধ্যে চলে।
২. শিল্প খাত ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সেতুবন্ধন: সিলেবাস তৈরির কমিটিতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের রাখলে চলবে না। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সফল উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের এই কমিটিতে যুক্ত করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে বাজারে কোনো ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে, তা শিল্প খাতের প্রতিনিধিরাই সবচেয়ে ভালো জানেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই শিক্ষকরা পাঠ্যক্রম সাজাবেন।
৩. মুখস্থবিদ্যার বদলে প্রায়োগিক দক্ষতায় জোর: পরীক্ষায় খাতায় কে কত পৃষ্ঠা লিখতে পারল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সে বাস্তবমুখী সমস্যা কতটা সমাধান করতে পারে তার ওপর। প্রজেক্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট ভিত্তিক কাজ, প্রেজেন্টেশন এবং হাতে-কলমে শিক্ষাকে সিলেবাসের মূল ভিত্তি করতে হবে।
৪. সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়: এনকিউএফের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা (ভোকেশনাল) এবং মাদরাসা শিক্ষার মানদণ্ডকে একটি নির্দিষ্ট ছাতার নিচে আনতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যেন চাইলেই যেকোনো সময় নিজের ট্র্যাক পরিবর্তন করে নতুন কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেই ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা কাঠামোতে থাকতে হবে।
৫. শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ: শুধু সিলেবাস বদলালেই রাতারাতি কোনো জাদু হবে না; যারা পড়াবেন, সেই শিক্ষকদেরও প্রস্তুত করতে হবে। অনেক সময়ই দেখা যায়, নতুন সিলেবাস পড়ানোর মতো পর্যাপ্ত ধারণা শিক্ষকদের থাকে না। তাই সিলেবাস হালনাগাদ করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জন্যও আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে এই প্রশিক্ষণেও ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টদের যুক্ত করতে হবে।
২০২৬ সালের এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে পুরোনো সিলেবাস আঁকড়ে ধরে বসে থাকার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। আমাদের তরুণরা প্রচণ্ড মেধাবী, তাদের শুধু সঠিক পথটা দেখিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। একটি কার্যকর ‘জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো’ প্রতিষ্ঠা করা এখন আর কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, বরং এটি আমাদের অর্থনীতি এবং তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষার হাতিয়ার।
শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে যুগের সঙ্গে মানানসই করে শক্ত রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। সরকারের উচিত আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই কাঠামো বাস্তবায়নে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post