সুরাইয়া বিনতে হাসান: ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব ও পরিবারকে ঘিরে ব্যস্ততা আর নতুন স্বপ্নের রং। ছোটবেলা থেকে ঈদ ঘিরে মানুষের যে আবেগ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলায় ঠিকই, কিন্তু গুরুত্ব কমে না। রোজার মাস শেষ হতে না হতেই শহর থেকে গ্রাম সবখানেই শুরু হয় ঈদের বাজারের প্রস্তুতি। শপিংমল, ফুটপাত, অনলাইন দোকান কিংবা স্থানীয় বাজার সব জায়গায় উপচে পড়া ভিড়। তবে এই উৎসবের সবচেয়ে বড় চাপটা নীরবে বহন করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের ঈদ আনন্দের পাশাপাশি হয়ে ওঠে হিসাব-নিকাশের এক দীর্ঘ সমীকরণ।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সাধারণত সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসাÑসবকিছু সামলে ঈদের জন্য আলাদা বাজেট তৈরি করা সহজ নয়। কিন্তু তারপরও ঈদ এলে পরিবারে আনন্দ ধরে রাখতে তারা নিজেদের সাধ্যের ভেতরে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। অনেক সময় নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোই হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
ঈদ বাজারে গেলে মধ্যবিত্ত মানুষের চোখে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দ্বিধা। একটি পোশাক পছন্দ হলো, কিন্তু দাম শুনে আবার সেটি রেখে দেওয়া। একটি জুতা হাতে নেওয়া, আবার বাজেটের কথা ভেবে অন্য দোকানে যাওয়া। এই শ্রেণির মানুষ কখনো পুরোপুরি বিলাসিতায় ভাসতে পারে না, আবার নিজেদের অভাবও প্রকাশ করতে চায় না। তাই তাদের ঈদ বাজার এক ধরনের নীরব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান সময়ে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্তের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও যে টাকায় পুরো পরিবারের ঈদের কেনাকাটা করা যেত, এখন সেই টাকায় একজনের প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটে না। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী থেকে শুরু করে সেমাই, চিনি, গরুর মাংসÑসবকিছুর দাম যেন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ঈদের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি উদ্বেগ।
বিশেষ করে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। সন্তান হয়তো নতুন জামা চাইছে, স্ত্রী একটি শাড়ি পছন্দ করেছেন, বাবা-মায়ের জন্যও কিছু কিনতে হবেÑসবকিছু মিলিয়ে একজন মধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে থাকেন। অনেক সময় নিজের জন্য কিছু না কিনেই পরিবারের অন্য সদস্যদের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করেন। ঈদের দিন পরিবারের সবাই নতুন পোশাক পরলেও হয়তো সেই মানুষটির পুরোনো পাঞ্জাবিই ভরসা হয়ে থাকে।
মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা স্বপ্ন দেখতে জানে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে প্রতিটি পদক্ষেপে হিসাব করতে হয়। ঈদ বাজারে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি পরিবার হয়তো অনেক পরিকল্পনা করেছিল কোথাও ঘুরতে যাবে, ভালো রেস্টুরেন্টে খাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজেটের কারণে সব পরিকল্পনা ছোট হয়ে আসে। তবুও তারা আনন্দ খুঁজে নেয় ছোট ছোট মুহূর্তে। কারণ মধ্যবিত্ত মানুষ জানে, সুখ মানেই কেবল বিলাসিতা নয়, পরিবারের মানুষগুলো একসঙ্গে ভালো থাকা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ঈদের বাজারে আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে সামাজিক চাপ। সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা মধ্যবিত্তকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে। আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের সামনে নিজেকে পিছিয়ে পড়া দেখাতে না চাওয়ার মানসিকতা অনেককে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করতে বাধ্য করে। কেউ কেউ ঋণ করেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন কিংবা সঞ্চয় ভেঙে ফেলেন শুধু একটি ভালো ঈদ উদ্যাপনের জন্য। অথচ ঈদ শেষ হওয়ার পর সেই অর্থনৈতিক চাপই আবার দীর্ঘশ্বাস হয়ে ফিরে আসে।
তবে এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদে এক ধরনের আন্তরিকতা থাকে, যা অনেক সময় বিত্তশালীদের আয়োজনেও খুঁজে পাওয়া যায় না। একসঙ্গে ইফতার করা, পরিবারের ছোটদের জন্য গোপনে উপহার কেনা, শেষ রাতে বাজার থেকে দরদাম করে কেনাকাটা করা কিংবা ঈদের সকালে সবার মুখে হাসি দেখার আনন্দ এসব অনুভূতিই মধ্যবিত্ত জীবনের সৌন্দর্য।
বর্তমানে অনলাইন শপিংয়ের প্রসার ঈদ বাজারের চিত্র বদলে দিয়েছে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন তুলনামূলক কম দামে পণ্য খুঁজে নিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করছে। তবে এখানেও প্রতারণা, নিম্নমানের পণ্য কিংবা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ নতুন ধরনের ভোগান্তি তৈরি করছে। ফলে সাশ্রয়ের আশায় করা কেনাকাটাও কখনো কখনো হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো সংযম, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগি করে নেওয়া। কিন্তু বাস্তব সমাজে অনেক সময় ঈদ যেন ভোগবাদের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দামি পোশাক, বিলাসী আয়োজন কিংবা বড় বড় কেনাকাটার প্রদর্শন মধ্যবিত্ত মানুষের মনে অজান্তেই চাপ তৈরি করে। অথচ ঈদের আনন্দের মূল সৌন্দর্য থাকা উচিত সম্পর্কের উষ্ণতায়, ভালোবাসায় এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে।
মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে ঈদ কখনো শুধুই উৎসব নয়, এটি দায়িত্ব, আত্মত্যাগ এবং ভালোবাসার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। তারা সীমিত সামর্থ্যের ভেতরেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে যায়। হয়তো তাদের ঈদে জাঁকজমক কম থাকে, কিন্তু আন্তরিকতা থাকে সবচেয়ে বেশি।
তাই ঈদ বাজারে মধ্যবিত্তের হিসাব-নিকাশ কেবল অর্থের অঙ্ক নয়, এটি স্বপ্ন, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং পরিবারের প্রতি নিঃশব্দ ভালোবাসার গল্প। এই গল্পে কষ্ট আছে, চাপ আছে, তবুও আছে এক টুকরো সুখ ধরে রাখার অবিরাম চেষ্টা। আর সেই চেষ্টার মধ্যেই বেঁচে থাকে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় শ্রেণিটির অনুচ্চারিত সংগ্রাম ও সৌন্দর্য।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post