নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ ২ হাজার ৮০০ টন পণ্য চালানের নিলাম সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান কনটেইনার জট ও এর ফলে উদ্ভূত নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নিরসন, ভৌত ও আর্থিক নিরাপত্তাসহ জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ সর্বোপরি চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস অখালাসকৃত ও নিলামযোগ্য বিভিন্ন পণ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রয়ের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় কাস্টমসের নিলাম স্থাপনায় সংরক্ষিত ‘ব্যবহƒত ড্রেজার স্টিল পাইপ, রাবার হোস, সংযোজনী ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী’ শীর্ষক প্রায় ২ হাজার ৮০০ টন পণ্য অনলাইন নিলামের মাধ্যমে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সাপেক্ষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন নিলাম প্ল্যাটফর্মে গত ১৫ ডিসেম্বর প্রতিযোগিতামূলক এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে মোট ১৩ জন দরদাতা অংশ নেন।
নিলামে সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পণ্য চালানটি বিক্রি হয়। পরবর্তী সময়ে দও মূল্য, মূল্য সংযোজন কর ও আয়করসহ মোট ১১ কোটি ৫৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধের পর দরদাতার অনুকূলে পণ্য খালাস সম্পন্ন করা হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানায়, পণ্যের পরিমাণের দিক থেকে এটি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সর্ববৃহৎ নিলাম। এই নিলামের ফলে একদিকে কাস্টমসের নিলাম স্থাপনার বড় অংশ খালি করা সম্ভব হয়েছে। অপরদিকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি বন্দরের ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা ফিরে এসেছে।
অখালাসকৃত ও নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অনলাইন নিলাম কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বহুমুখী চাপের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। আগের তুলনায় সব খাতে এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর। গত বছর সবকটি প্রধান সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই এক বছরে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজ চলাচল, রাজস্ব আয় এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণÑসব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে।
গত এক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়।
বন্দর সূত্র জানায়, আগের বছরের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংযোজন ও ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। উন্নত জাহাজ ব্যবস্থাপনার কারণে ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে একাধিক দিন বন্দরে জাহাজের ‘ওয়েটিং টাইম’ শূন্যে নেমে আসে।
জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে জাহাজের গড় টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম ছিল ২ দশমিক ৫৩ দিন এবং কনটেইনারের গড় ডুয়েল টাইম ছিল ৯ দশমিক ৪৪ দিন। চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) পরিচালিত টার্মিনালগুলোতেও ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। একই বছরে বন্দর সরকারকে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা। গত ২৩ ডিসেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়।
এছাড়া ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিদর্শনে ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ এবং আধুনিক হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে।
পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ও ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে কোনো বাধা থাকল না। গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে বিএনপিপন্থি দুই শ্রমিক সংগঠনের ডাকা ধর্মঘটে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারি ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণার পর দুই শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে গিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন থেকে ধর্মঘটের প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি স্কপের কর্মসূচি ঘোষণা করেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তপন দত্ত।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post