রামিসা রহমান : দেশজুড়ে চলমান সিলিন্ডার গ্যাস সংকট ধীরে ধীরে একটি গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার কাজ এখন অনেক পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে একটি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ছিল এক হাজার ৫০০ টাকার আশপাশে, সেখানে বর্তমানে সেই একই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা পর্যন্ত। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার যেসব এলাকায় এখনও পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ নেই, সেসব এলাকার বাসিন্দারা পড়েছেন চরম বিপাকে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শহরে নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায় লাইনের গ্যাস না থাকায় মানুষ পুরোপুরি নির্ভরশীল সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে সেই গ্যাস ব্যবহার করা অনেক পরিবারের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে গড়ে মাসে দুই থেকে তিনটি সিলিন্ডার গ্যাস প্রয়োজন হয়। বর্তমান দামে যার খরচ দাঁড়াচ্ছে আট হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, বাজার খরচ, শিক্ষা ব্যয় যোগ হলে সংসার চালানো রীতিমতো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে-বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সিলিন্ডার গ্যাসনির্ভর বাসাগুলোতে একের পর এক ভাড়াটিয়া বাসা ছাড়ছেন। কেউ চলে যাচ্ছেন এমন এলাকায় যেখানে এখনও লাইনের গ্যাস আছে, কেউ আবার শহরের প্রান্তিক এলাকায় কম খরচের বাসার সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিচ্ছেন সংসার খরচ কমানোর জন্য।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী সালেহা খানম শেয়ার বিজকে বলেন, আগে গ্যাসের জন্য মাসে দুই হাজার টাকার মতো খরচ হতো। এখন শুধু রান্নার গ্যাসেই আট হাজারের বেশি চলে যাচ্ছে। এত খরচ দিয়ে এই বাসায় থাকা সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়ে বাসা ছেড়ে দিচ্ছি।
আগে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা; যা পরে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। বাস্তবে এ দামে কোনো সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে ৪ হাজার টাকা দিয়েও মানুষ সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে পারছেন না।
মিরপুরের গৃহিণী তনু আক্তার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আগে রান্না নিয়ে চিন্তা ছিল না। এখন প্রতিবার চুলা জ্বালানোর সময় ভাবতে হয় আর কতদিন চলবে এই সিলিন্ডার?’ সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে গেছে। কেউ কেউ রান্নার সময় বাঁচাতে চেষ্টা করছেন, কেউ আবার খাবারের মেনু সীমিত করছেন। কিন্তু এসব কৌশল মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে, সংসারে অশান্তি তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি খাতের এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মানুষের বসবাসের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। শহরের ভাড়াবাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। যেখানে আগে ভাড়াটিয়ার চাহিদা বেশি ছিল, সেখানে এখন বাসা ফাঁকা পড়ে থাকছে। আবার লাইনের গ্যাস থাকা এলাকায় ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে। গ্যাস সংকটের প্রভাব আমরা শুধু রান্নাঘরে দেখছি না, এটি শহরের সামাজিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে। মানুষ বাসা বদলাচ্ছে, এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হেলাল উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে, আর ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এই সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধানের ইঙ্গিত নেই। সরকারি পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং বাজারে গ্যাসের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণমাধ্যমকে বলেছেন, জানুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তাপর্যায়ে এলপি গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা থেকে ৫৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে করে প্রতি ১২ কেজি সিল্ডিারের দাম পড়বে ১ হাজার ৩০৬ টাকা।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস. এম. নাজের হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, এই সংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের। যাদের আয় নির্দিষ্ট এবং বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে রান্নার খরচ কমাতে একবেলা রান্না, বাইরে থেকে খাবার আনা কিংবা বিকল্প উপায়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এসব সমাধান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।
সব মিলিয়ে সিলিন্ডার গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নার সমস্যা নয়। এটি মানুষের বাসস্থান, জীবনযাপন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শহরজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post