মো. বাইজিদ শেখ: এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমোঘ আহ্বানে যখন চারদিক মুখরিত হয়, তখন যেন বাংলার আকাশ-বাতাস নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। চৈত্রের খরতাপে যখন প্রকৃতি হাঁসফাঁস করে, মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তখন কালবৈশাখীর রুদ্ররূপ নিয়ে বৈশাখ আসে সব জরাজীর্ণতা, মলিনতা আর অশুভকে উড়িয়ে দিতে। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষকের সুবিধার্থে যে ‘ফসলি সন’ হিসেবে বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়েছিল, কালের আবর্তনে তা আজ বাঙালির হাজার বছরের চিরায়ত ঐতিহ্যের এক আবেগময় সম্মিলনে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর দিন নয়; এটি আমাদের শেকড়ের সন্ধান, অসাম্প্রদায়িক চেতনার জাগরণ এবং আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার দিন। আধুনিকতার এই যুগে, যখন বহুতল ভবনের ইটের দেয়ালে বন্দি হয়ে যাচ্ছে আমাদের নাগরিক জীবন, গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে আমরা যখন ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা মূলত মাটির কাছাকাছি থাকা এক নদীমাতৃক দেশের সন্তান। কংক্রিটের জঙ্গলে বসেও রমনার বটমূলে ছায়ানটের সেতারের মূর্ছনা কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের শিহরিত করে। ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল শহুরে উৎসব নয়, এগুলো আমাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম। অপশক্তির রক্তচক্ষু ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এটি বাঙালির শৈল্পিক প্রতিবাদ । তবে বৈশাখের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বাংলার আটপৌরে গ্রামীণ জীবনে এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামে। এই উৎসবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষকের ঘাম, তাঁতীর বোনা স্বপ্নের শাড়ি এবং মৃৎশিল্পীর বেঁচে থাকার আকুতি । পুরোনো ঢাকার শাঁখারি বাজার বা তাঁতীবাজারে হালখাতার মিষ্টির ঘ্রাণ থেকে শুরু করে গ্রামীণ মেলার নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ সবখানেই ছড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত মায়া । একটি ছোট্ট গল্পের দিকে তাকালেই আমরা বাঙালির এই বৈশাখী আবেগের আসল রূপটি দেখতে পাব।
গল্পটা রতন পালের । বয়স ষাটের কোঠা পেরিয়েছে । পৈতৃক পেশা হিসেবে কাদামাটি ছেনে হাঁড়ি, শখের পাত্র আর রং- বেরঙের টেপা পুতুল বানান তিনি। এক সময় চৈত্রসংক্রান্তি বা বৈশাখী মেলা এলে তার ব্যস্ততার শেষ থাকত না ।
সারা রাত জেগে উনুনের আঁচে পুতুল পোড়াতেন। কিন্তু আজকাল দিন বদলেছে। মেলায় এখন প্লাস্টিকের তৈরি আর ব্যাটারিতে চলা চোখ-ধাঁধানো ভিনদেশি খেলনার ছড়াছড়ি। সেই যান্ত্রিক শব্দের ভিড়ে রতন পালদের হাতের আদরে গড়া মাটির পুতুলের কদর কমে গেছে। রতন পালের সংসার আর ঠিকমতো চলে না, বয়সের ভারে শরীরও এখন আর আগের মতো সায় দেয় না। এবারের পহেলা বৈশাখের আগে তার দশ বছরের নাতনি টুনি বায়না ধরেছিল একটি লাল-সাদা শাড়ির জন্য। কিন্তু রতন পালের পকেটে সেই সামর্থ্য ছিল না। বুকভরা কষ্ট, একরাশ হতাশা আর বাঁশের ঝুড়িভর্তি একঝাঁক মাটির খেলনা নিয়ে তিনি বসেছিলেন গ্রামের পাশের এক বৈশাখী মেলায়। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। কাঠফাটা রোদে ঘামে ভিজে একাকার তিনি। চারপাশের প্লাস্টিকের খেলনার দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড়, শিশুদের কোলাহল । কিন্তু রতন পালের পসরায় সাজানো মাটির পাখি, হাতি আর ঘোড়াগুলো অবহেলায় পড়ে আছে। নাতনির অপেক্ষারত মুখটা মনে পড়তেই লোকচক্ষুর আড়ালে গামছায় চোখ মুছলেন তিনি হঠাৎ পড়ন্ত বিকেলে শহর থেকে আসা একটি পরিবার মেলার সেই প্রান্তে এসে দাঁড়াল। তাদের আট বছরের ছোট্ট মেয়েটি চারদিকের ঝলমলে যান্ত্রিক খেলনাগুলো পাশ কাটিয়ে রতন পালের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। একটি লাল-নীল রঙের মাটির পাখির দিকে ছোট্ট আঙুল নির্দেশ করে সে তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, আমি এই মাটির পাখিটা নেব। দেখ, কী সুন্দর!’ মেয়েটির বাবা হেসে রতন পালের হাতে ১০০ টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়ে পাখিটা কিনে নিলেন । রতন পাল অবাক হয়ে দেখলেন, আধুনিক পোশাকে থাকা ছোট্ট মেয়েটি পরম মমতায় মাটির পাখিটা বুকে জড়িয়ে আছে। ওই ১০০ টাকার নোটে রতন পাল কেবল তার নাতনির লাল-সাদা শাড়িটিই দেখেননি; তিনি দেখেছিলেন বাংলার হাজার বছরের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের বেঁচে থাকার আশা। ওই ছোট্ট মেয়েটির হাসিতে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক চিরন্তন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, যেখানে আধুনিকতার সঙ্গে শেকড়ের এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে । মেলা শেষে নাতনির জন্য যখন তিনি শাড়িটি কিনে বাড়ি ফিরলেন, টুনির মুখের সেই অমলিন হাসি রতন পালকে বুঝিয়ে দিল বাঙালি তার শেকড়কে এখনও পুরোপুরি ভুলে যায়নি।
রতন পালের এই গল্পটি আসলে আমাদের সবার গল্প । আধুনিক জীবনের ইঁদুর দৌড়ে আমরা হয়তো প্রতিনিয়ত অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলছি, বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে গা ভাসাচ্ছি, কিন্তু পহেলা বৈশাখ এলে আমাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বাঙালি সত্তা ঠিকই জেগে ওঠে। মেলায় গিয়ে
মাটির জিনিস কেনা, হালখাতার মিষ্টি খাওয়া, ইলিশ- পান্তার আয়োজনে মেতে ওঠা কিংবা প্রিয়জনকে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানানোএগুলো কেবল উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, এগুলো আমাদের শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার বহিপ্রকাশ। এই দিনটি আমাদের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প এবং মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাস্তব জীবনে বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য বৈশাখ মানে নতুন হালখাতা খুলে দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। কৃষকের কাছে এটি নতুন ফসলের হিসাব মেলাবার দিন, গোলা ভরার প্রত্যাশা। অন্যদিকে, আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে বৈশাখ হলো ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডকতা ও অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক অলিখিত শপথ । মঙ্গল শোভাযাত্রার সেই বিশাল বাঘ, পেঁচা বা টেপা পুতুলের মুখোশগুলো কেবল শিল্পের নিদর্শন নয়; সেগুলো অশুভ শক্তিকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার এবং সত্য ও সুন্দরকে আবাহন করার প্রতীক । বর্তমান সমাজ বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা দেখি, সমাজে কত বিভেদ ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে, মানুষে মানুষে, এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শেও। কিন্তু পহেলা বৈশাখ এমন এক ঐন্দ্রজালিক দিন, যেদিন মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, ক্ষেতমজুর, করপোরেট চাকরিজীবী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। সবার পরনে থাকে লাল-সাদা রঙের ছোঁয়া, সবার মুখে উচ্চারিত হয় এক অসাম্প্রদায়িক স্লোগান ‘শুভ নববর্ষ’ । পৃথিবীর বুকে এমন একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, সার্বজনীন ও প্রাণের উৎসব সত্যিই বিরল, যা একটি গোটা জাতিকে একই সুতোয় গেঁথে রাখে। পহেলা বৈশাখ কেবল এক দিনের জন্য বাঙালি সাজার দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যতই বিশ্বায়ন আমাদের গ্রাস করুক না কেন, নিজের শেকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আমাদের থাকতেই পারে, কিন্তু পা দুটি মাটিতেই রাখতে হবে। রতন পালের মাটির পাখির মতো আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, ভাষা
ও ঐতিহ্যকে পরম মমতায় বুকে আগলে রাখতে হবে। কালবৈশাখীর ঝড় আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবন থেকে সমস্ত গ্লানি, হতাশা, দুর্নীতি ও অন্ধকারকে চিরতরে উড়িয়ে নিক । নতুন বাংলা বছর বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনে বয়ে আনুক সাম্য, সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক মুক্তি ও অনাবিল ভালোবাসা। শেকড়ের টানে, প্রাণের স্পন্দনে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক বাঙালির পহেলা বৈশাখ ।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post