অশোক দত্ত : সচিবালয়ে শুরু হয়েছে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বন্ধে কড়া নজরদারি। সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্লাস্টিক বন্ধের এমন পদক্ষেপ কার্যকর হওয়ায় দেশজুড়ে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে নতুন যুগের সূচনা হলো।
গতকাল রোববার থেকে সচিবালয়ের প্রতিটি প্রবেশপথে শুরু হয়েছে কঠোর তল্লাশি। ভেতরে কেউ পলিথিন বা প্লাস্টিকসামগ্রী নিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ করা হচ্ছে। যাদের কাছে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে কাগজ বা পাটজাত ব্যাগ। সচিবালয়ের প্রবেশদ্বার ও অভ্যন্তরে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা-সংবলিত বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান চৌধুরী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আজ (রোববার) থেকে সরকারি অফিসগুলোকে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক থেকে মুক্ত করার যাত্রা শুরু করলাম। এটা অভ্যাসের বিষয়। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়মিতভাবে নজরদারি করা হবে। আশা করছি, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে সচিবালয় সম্পূর্ণভাবে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক মুক্ত হবে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে ক্যাবিনেট সচিবসহ সব সচিবদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে এবং সব মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিবকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
রেজওয়ানা হাসান আরও বলেন, আমরা শুরু থেকেই প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছি। এখন সচিবালয়ে কোনো সভা-সেমিনার বা মিটিংয়ে প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার করা হচ্ছে না। নতুন বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কোনো প্লাস্টিক বোতল দেখা যাবে না।
তিনি বলেন, দেশে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক এখনো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ নয়, তবে সরকার প্রথমে সরকারি পর্যায় থেকেই উদাহরণ স্থাপন করতে চায়।
এর আগে গত শনিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এসব প্লাস্টিকসামগ্রী বন্ধে সচিবালয়কে অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, সভা-সেমিনারে প্লাস্টিকের বোতল, কাপ, প্লেট ও চামচ ব্যবহার করা যাবে না। এর পরিবর্তে পাট, কাপড়, কাগজ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্যোগটি পর্যবেক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম কাজ করছে বলে জানা গেছে। সচিবালয়ে এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব শেয়ার বিজকে বলেন, শুধু সচিবালয়ে নজরদারি করলে সাফল্য আসবে না, যদি বড় বড় প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করা না যায়। তিনি বলেন, প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি বন্ধে সরকার কঠোর না হলে এর সুফল পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার যদি কঠোর নজরদারি করে প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন রোধ করতে পারে, তাহলে এমন উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় সফলভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বন্ধে সরকার এর আগে বহুবার বহু রকমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে পলিথিন ও পলিপ্রপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে। ধাপে ধাপে একবার ব্যবহারযোগ্য অন্যান্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধের পরিকল্পনাও সরকারের হাতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচিবালয়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব আচরণ ছড়িয়ে পড়বে, যা সারা দেশে প্লাস্টিকবিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
দেশে ২০০২ সালেই পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়, তবে বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। বর্তমানে ব্যবহƒত প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হলেও মাত্র ৩৭ শতাংশ প্লাস্টিকই আবার ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যরে বড় অংশই নদী, খাল ও সমুদ্রে গিয়ে জমা হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনশিল্পের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, টেকসই বিকল্প পণ্য সহজলভ্য করা গেলে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিবর্তন আনবে। পাটজাত ও জৈব-বিয়োজ্য পণ্য ব্যবহারে সরকারি প্রণোদনা ও করছাড় দেয়া হলে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে রপ্তানির সুযোগও বাড়বে বিশেষ করে ইউরোপের মতো বাজারে, যেখানে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাদের মতে, সচিবালয়ে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ওপর নজরদারি শুরু করার এই সিদ্ধান্ত শুধু প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা নয়, এটি টেকসই সরকারি প্রশাসনের সূচনা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post