নিজস্ব প্রতিবেদক : শেষ হলো অপেক্ষার পালা। বছর ঘুরে আবার এলো বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা। কাঁসর ঘণ্টা, ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধুর আবহে বাঙালি হিন্দু সম্প্র্রদায়ের ঘরে ঘরে এখন শুধু আনন্দ-উল্লাস। আর এই আনন্দের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ প্রত্যন্ত গ্রামে তথা সারা দেশে। দেবী দুর্গার আবাহনের সুরে মুখর চারদিক। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন এই চিরন্তন বার্তা নিয়েই দেবী দুর্গা অবতীর্ণ হয়েছেন মর্ত্যেলোকে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় পঞ্চমীর আচার অনুষ্ঠান বোধনের মধ্য দিয়ে আহ্বান জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। আর আজ রোববার মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধুর আবহে বাঙালি হিন্দু সম্প্র্রদায়ের ঘরে ঘরে এখন শুধু আনন্দ-উল্লাস।
বোধন শব্দের অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্তি। শাস্ত্রমতে শরৎকাল দেবদেবীর নিদ্রাকাল। এই সময়ে পূজার পূর্বশর্ত হলো দেবীকে জাগ্রত করা। তাই পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বেলশাখায় দেবী দুর্গার বোধন করা হয়।
পুরাণে মতে, অসুররাজ রাবণকে বধ করার জন্য ভগবান শ্রী শ্রী রামচন্দ শরৎকালে নিদ্রামগ্ন দেবীকে জাগ্রত করে দুর্গার পূজা শুরু করেছিলেন। সেই থেকেই দুর্গাপূজায় বোধনের প্রচলন। শাস্ত্রমতে, দক্ষিণায়নের সময় দেবীরা বিশ্রামে থাকেন বলে তাদের পূজা করতে হলে আগে তাকে নিদ্রা থেকে জাগ্রত করতেÑ সেই কারণেই দুর্গাপূজার বোধনকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়।
সাধারণত ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়েই শুরু হয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তরা বিশ্বাস করেন এই দিন দেবী সন্তানদের নিয়ে কৈলাস ছেড়ে বাবার বাড়ি মর্ত্যলোকে আসেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সর্বজনীন পূজা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উত্তম চক্রবর্তী বলেন, ষষ্ঠী পূজায় বিল্ববৃক্ষের নিচে দেবীকে ষষ্ঠাধী কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে মাকে মন্দির আঙিনায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর দেবীকে স্নান করিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। উলুধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খ আর ঢাক ঢোলের বাজনায় ভোর থেকেই রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র ভক্তরা দেবীকে বরণ করে জানিয়ে দিয়েছে মা এসেছেন।
পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার দুর্গোৎসবের দিনগুলো হলোÑ রোববার ২৮ সেপ্টেম্বর: মহাষষ্ঠী, সোমবার ২৯ সেপ্টেম্বর: মহাসপ্তমী, মঙ্গলবার ৩০ সেপ্টেম্বর: মহাঅষ্টমী, বুধবার ১ অক্টোবর: মহানবমী এবং বিজয়া দশমীর সূচনা। রোববার, ১৩ অক্টোবর: বিজয়া দশমী ও প্রতিমা নিরঞ্জন। এই পাঁচ দিন ধরে চলবে আনন্দ, ভক্তি আর পূজার্চনা।
শাস্ত্র মতে এই বছর দেবী দুর্গা আসবে গজে (হাতি) এবং গমন করবে দোলায় (পালকি)। গজে আগমনকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও শস্য-শ্যামলার প্রতীক ধরা হয়। তবে দোলায় গমন মহামারি বা অশুভ সংকেতের প্রতীক বলে বিশ্বাস রয়েছে ভক্তকুলে।
তবে ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী মর্ত্যে এসেছেন শান্তি ও মঙ্গলধ্বনি ছড়িয়ে দিতে।
রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন উৎসবের সাজ। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে শিল্পীরা অলংকারে সাজিয়েছেন দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে। প্রতিটি প্রতিমায় তাদের নিপুণ কারুকাজ যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
প্যান্ডেল সাজানোর কাজও শেষ কারিগরদের। কোথাও মিসরীয় থিম, কোথাও মুক্তিযুদ্ধ, আবার কোথাও আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া। আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে মণ্ডপ ও সড়ক।
শুধু মণ্ডপ নয়, ঘরেও চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। মুড়ি-নাড়ু, মিষ্টি, পিঠা-পুলি তৈরি নিয়ে ব্যস্ত নারী-পুরুষ সবাই। প্রতিটি পরিবারে এখন দেবীকে বরণের উচ্ছ্বাস।
ত্রেতাযুগে রাবণবধের আগে ভগবান রাম যে অকালবোধন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় দুর্গাপূজা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শারদোৎসবে রূপ নিয়েছে। মহালয়ায় দেবীর আবাহন, ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত পূজা, আর দশমীতে বিসর্জনÑ এই আচারগুলো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বাস করা হয়, মা দুর্গা প্রতিবছর শরতে কন্যারূপে আসেন পিতৃগৃহে। সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে যান কৈলাসে। তাই এই উৎসব বাঙালি পরিবারের কাছে শুধু ধর্মীয় নয়, আবেগঘন মিলনমেলারও প্রতীক।
ষষ্ঠীর প্রভাত থেকেই প্রতিটি মণ্ডপে ভক্তরা হাত জোড় করে প্রার্থনা করছেন মা, তুমি বিশ্ববাসীকে শান্তি দাও, অশুভ শক্তির বিনাশ করো, দুঃখ-কষ্ট দূর কর। সবাইকে সুস্থ রাখ, ভালো রাখ।
একইসঙ্গে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মিলনমেলা পূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব।
ঢাক-ঢোলের তালে, শঙ্খ আর উলুধ্বনির মধুর সুরে মুখরিত হয়েছে সারাদেশ। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আনন্দ-উল্লাস। পূজা মানেই কেবল আচার নয়, বরং পরিবার, সমাজ আর জাতির মিলনোৎসব।
ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হলো সেই বহুল প্রতীক্ষিত শারদোৎসব। এবারও দেবীর আবাহনে মুখরিত হলো বাংলার আকাশ-বাতাস। বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপূজা আবারও ছড়িয়ে দিল মঙ্গল আর শুভ্রতার বার্তা।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post