মনিরুল হক : বিশ্বব্যাপী দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার। বলা যায় অনেকটা পুঁজিবাজারের মতো চলে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার। ক্রিপ্টোকারেন্সির জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী বাড়তে থাকলেও বাংলাদেশে এটি বৈধ নয়। তারপরও ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ থাকায় এই মুদ্রার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে দেশের মানুষের।
বিশেষ করে তরুণ ছেলেমেয়েদের মধ্যে ক্রিপ্টোর ব্যবহার বেশি। ফ্রিল্যান্সারদের অনেকেই এখন তাদের কাজের পারিশ্রমিক ক্রিপ্টোতে নিয়ে থাকে। ক্রিপ্টো আদান-প্রদানে দেশে বেশি ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে বাইনান্স নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।
এদিকে দেশে ক্রিপ্টোর লেনদেন নিরুৎসাহিত করে অনেক বছর আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেই ক্ষান্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালে তাদের ওয়েবসাইটে কৃত্রিম মুদ্রায় (যেমন বিটকয়েন) লেনদেন থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। বিজ্ঞপ্তিতে ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বলে, ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ-সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করেনি।
নিজেরা একটি ডিজিটাল মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেই উদ্যোগও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মুদ্রা চালুর আভাস দেয় সরকার। ওই অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। এরপর আরও তিনটি বাজেট হয়েছে, কিন্তু ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি ওই বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারও ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি আলোচনায় ওঠেনি। তবে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল মুদ্রা অনেক বড় একটি বিষয়। এটা চালু করার প্রক্রিয়াও অনেক ব্যাপক। এর জন্য সময় লাগবে।
জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই ডিজিটাল মুদ্রা চালু করেছে।
এদিকে ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বে ক্রিপ্টোকরেন্সি প্রথম চালু হয় ২০০৯ সালে। গত ১৬ বছরে এর বাজার কয়েক হাজার গুণ বড়েছে। বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে বিটকয়েন। বর্তমানে ‘বিটকয়েনে’ মোট বাজারদর ৯১৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। এরপর ‘ইথেরিয়াম’ যার বর্তমান মোট বাজারদর ৪৮৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
এরপর আছে ‘বাইনান্স কয়েন’, যার মোট বাজারদর ১৬৮ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে ‘টিথার’, যার মোট বাজার দর ৭৭ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। এরপর আছে ‘এক্সআরপি’, যার মোট বাজার দর ৪৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর আছে ‘ইউএসডি কয়েন’, যার মোট বাজার দর ৪২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। এরপরের অবস্থানে আছে ‘কার্ডানো’, যার মোট বাজার দর ৩২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এরকম অসংখ্য ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে।
বর্তমানে বিভিন্ন উৎস অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সির সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩৭ হাজারেরও বেশি। কয়েনজেকোর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ হাজারের বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাক করা হচ্ছে, তবে ট্যানজেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষের দিকে ৩৭ মিলিয়নেরও বেশি টোকেন তৈরি হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকগুলোই এখন নিষ্ক্রিয়।
এই ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের অনেক মাধ্যম আছে। বেবিট, কুকয়েন, বিটপে, বিটগেট, টনকিপারের মতো প্ল্যাটফর্ম থাকলেও বাইনান্স বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জার। ২০১৭ সালে চীনের ‘চাংপেং ঝাও’ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে চীনে কার্যক্রম শুরু হলেও সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়ায় এটি দ্রুত জাপানে স্থানান্তরিত হয়। পরে মাল্টায় সদর দপ্তর করা হলেও বর্তমানে বাইনান্সকে একটি বিকেন্দ্রীভূত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এর নির্দিষ্ট কোনো বৈশ্বিক সদর দপ্তর নেই। ১৯০টিরও বেশি দেশে সেবা প্রদানকারী বাইনান্সে ব্যবহারকারীরা বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ হাজারো অল্টকয়েন কেনাবেচা করতে পারেন। এমনকি ক্রিপ্টো ধরে রেখে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগও রয়েছে। অন্যদিকে টাকা হারানোর ঝুঁকিও আছে। ব্যাংক ট্রান্সফার, কার্ড কিংবা অন্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে এখানে লেনদেন করা যায়।
বাংলাদেশে বাইনান্সের ব্যবহার শুধু ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন বেটিংয়ের মতো অবৈধ কার্যক্রমের পুরো লেনদেন প্রক্রিয়াটিও সম্পন্ন হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। যেহেতু সরকার জুয়া ও অনলাইন বেটিংকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এসব সাইট সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে পারে না। ফলে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোই হয়ে উঠছে বিকল্প পথ। এতে করে নিয়ন্ত্রণহীন অর্থপ্রবাহ যেমন বাড়ছে, তেমনি মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিও মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
আন্তর্জাতিক মার্কেট প্লেস থেকে আয় করা ফ্রিল্যান্সাররা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জটিলতার কারণে বিকল্প পথ হিসেবে অনেক সময় ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। বিশেষ করে বাইনান্সের মতো প্ল্যাটফর্মকে তারা আয়ের টাকা তুলতে কিংবা লেনদেনে ব্যবহার করছেন।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা কায়েস মোহাম্মদ সোহেল ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টের কাজ করে থাকেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি অনেক পেমেন্ট এখন ক্রিপ্টোতে নিয়ে থাকি। বিশেষ করে বাইনান্সে এই পেমেন্ট নেয়া অনেক সহজ। তাছাড়া সেখানে জমাকৃত ডলারের দর কখনও কখনও বাড়লে বেশি দামে বিক্রিও করা যায়।’
ফ্রিল্যান্সাররা বিদেশি ক্রেতদের কাছ থেকে বাইনান্সের মাধ্যমে বিটকয়েন, ইথেরিয়ামসহ হাজারো অল্টকয়েন ডলারের সমপরিমাণ নিয়ে সেটিকে বাইনান্সেই কনভার্ট করে বাংলাদেশে থাকা বাইনান্সের এজন্টের কাছে বিক্রি করে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে খুব সহজেই টাকা উত্তোলন করে নিচ্ছে। এতে যেমন সময় কম লাগছে অন্যদিকে উত্তোলন খরচও তুলনামূলক অনেক কম।
এছাড়া অনলাইন বেটিংয়ের লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হলো বাইনান্স। দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য সূত্র এটি নিশ্চিত করেছে। ২০১৪ সালে বিটকয়েনকে অবৈধ ঘোষণা করার পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও সংরক্ষণ সম্পূর্ণ বেআইনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ ও ২০২১ সালে আবারও জনসাধারণকে সতর্ক করে জানায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে জড়ালে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হবে। কারণ এটি অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রতারণার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামার কারণে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল লোকসানের শঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অবৈধ কার্যক্রমে অর্থায়নও এর মাধ্যমে সহজ হয়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ মুদ্রার ব্যবহার থেমে নেই।
বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখা হলেও বাংলাদেশে এটি এখনো আইনগতভাবে বৈধতা পায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের কঠোর নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপ থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশের কারণে গোপনে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বর্তমান বাস্তবতায় ক্রিপ্টো ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই অনেক বড়।
ব্লকচেইন অ্যানালিটিকস কোম্পানি চেনালাইসিসের একটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিশ্বের ১৫১টি দেশে ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নানা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কোন দেশ কতটা ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণ করছে, সে তালিকাও প্রকাশ করা হয়। তালিকার শীর্ষে আছে ভারত, নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। কোন দেশ কেমন ক্রিপ্টো গ্রহণ করছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৫ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে পেছনে আছে মিয়ানমার, তাদের অবস্থান ৭৮। পাকিস্তানের অবস্থান ৯, শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৭২, নেপালের অবস্থান ৭১ নম্বরে। তালিকা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৪, কানাডা ১৮, রাশিয়া ৭, চীন ২০, জাপান ২৩ ও অস্ট্রেলিয়া ৩৯ নম্বরে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post