সৈয়দ মুসতাফা মুনীরুদ্দীন : রোজার ধর্মীয় ও আত্মিক গুরুত্বের কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু শারীরিক উপকারের কথা কিন্তু অনেকেই সেভাবে জানি না। পাঠক, আসুন দেখি স্বাস্থ্যের জন্যও রোজার কী কী উপকারিতা রয়েছে-
দেহের টক্সিনগুলোকে বের করে দেওয়া: আমরা সাধারণত যে খাবারগুলো খাই, তার অধিকাংশই প্রসেসড খাবার। যেমন, রুটির চেয়ে পাউরুটি-বিস্কুট, কেক বা পিজার মতো খাবার আমাদের প্রিয় বেশি। বাইরে বেরুলে সহজে পাওয়াও যায় এগুলো। কিন্তু খাওয়ার পর দেহের ভেতর এগুলো টক্সিনে রূপান্তরিত হয়। এমনকি কোনো কোনো সময় তা অ্যাডভান্সড গ্লাইসেশন অ্যান্ড প্রোডাক্ট (Advanced Glycation End product ev AGE)-এ রূপান্তরিত হয়। পাঠকদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, বয়স এবং ডায়াবেটিসের কারণে মানুষের যে দুরারোগ্য ব্যাধিগুলো হয়, যেমন, অ্যাজমা, আথ্রারাইটিস, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিওর, দৃষ্টিশক্তি হারানো, দাঁত পড়ে যাওয়া, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদির পেছনে মূল কারণ হলো এই অঊে। তো রোজাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে এই ফ্যাট কমে এবং ক্ষতিকারক টক্সিনগুলো লিভার, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের মধ্য দিয়ে রেচনের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।
হজমক্রিয়ার বিশ্রাম: দেহের যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো খাবার হজমের কাজ করে, রোজার সময় তারা একটা বিরতি পায়। হজমের রস নিঃসরণটা তখন ধীর হয়। খাবারগুলোও ভাঙে ধীরে। দেহে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এটা খুব সহায়ক। দেহের জন্যে প্রয়োজনীয় শক্তিও তখন নিঃসরণ হয় ধীরে। অবশ্য রোজা রাখলেও পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ বন্ধ হয় না। এজন্যেই পেপটিক আলসারের রোগীদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেন।
অ্যালার্জি ও চর্মরোগ নিরাময়ে: জীবাণু বা আঘাতজনিত কারণে দেহ যে প্রক্রিয়ায় অসুস্থ হয়, গবেষণায় দেখা গেছে রোজা সে প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দেয়। ফলে রিউমাটয়েড আর্থ্রারাইটিস, অ্যালার্জি, সোরিয়াসিস নামক চর্মরোগ ইত্যাদি থেকে নিরাময়ে রোজার ভূমিকা আছে বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, পিত্তথলির রোগ আলসারেটিভ কোলাইটিস নিরাময়েও রোজার ভূমিকা আছে।
ব্লাড সুগার কমায়: রোজা রাখাকালীন একজন মানুষের দেহের গ্লুকোজগুলো দ্রুত ভাঙতে থাকে এবং দেহের জন্যে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে। ফলে তখন ইনসুলিনের উৎপাদন কমে যায়, যা প্যানক্রিয়াসকে কিছুটা বিশ্রাম দেয়। অন্যদিকে গ্লুকোজ ভাঙার সুবিধার্থে গ্লাইকোজেন তৈরি হয় আর এ সবকিছুর সম্মিলিত ফলাফল হলো দেহে ব্লাড সুগারের পরিমাণ কমানো, যা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়ক।
ফ্যাট কমায়: রোজার প্রথম প্রভাবই হলো গ্লুকোজের আধিক্য কমানো। আর গ্লুকোজ যখন কমে যায়, তখন কেটসিস নামে দেহের এক ধরনের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ফ্যাট কমায় এবং শক্তি জোগায়। এমনকি কিডনি বা পেশিতে যে ফ্যাট জমে তাও ক্ষয় হয়ে শক্তি উৎপাদিত হয়। ১৯৯৭ সালে অ্যানালস অব নিউট্রিশন মেটাবলিজমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, রোজা রাখলে দেহে খারাপ কোলেস্টেরল বা খউখ কমে প্রায় ৮ শতাংশ, ট্রাইগ্লিসারাইড কমে ৩০ শতাংশ এবং ভালো কোলেস্টেরল বা ঐউখ বাড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে হƒদরোগের ঝুঁকি কমে।
রক্তচাপ কমায়: বলা হয়, ওষুধ ছাড়া রক্তচাপ কমাবার এক আদর্শ পদ্ধতি রোজা। কারণ রোজা রাখলে প্রথমে গ্লুকোজ, পরে চর্বিকণাগুলো ক্ষয় হয়ে শক্তি উৎপাদন করে। রোজা রাখলে মেটাবলিক রেটও কমে। এড্রিনালিন এবং নরএড্রিনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন উৎপাদন কমে। আর এতে করে মেটাবলিক হার একটা স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। ফলে ব্লাড প্রেশার কমে। আর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এথেরেসক্লেরোসিস বা ধমনিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়ার ওপর, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়।
খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্তি: অনেকেরই অনেক ধরনের খারাপ অভ্যাসের প্রতি আসক্তি থাকে, যেমনÑধূমপান করা, অতিরিক্ত চিনিজাতীয় খাবার খাওয়া প্রভৃতি। রমজানে সারা দিন খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকায় অনেক ধরনের বাজে অভ্যাস থেকে দূরে সরে আসা সহজ হয়। একটানা কয়েক দিন বিরত থাকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেই অভ্যাসটা ত্যাগ করা যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এ কাজটা সংঘবদ্ধভাবে করা যায়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস রমজান মাসটাকে ধুমপান ছেড়ে দেবার জন্য আদর্শ সময় বলে আখ্যায়িত করেছে। কাজেই এ রমজানে যেকোনো একটা বদভ্যাসকে বেছে নিন, যা আপনি অনেক চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছেন না। এটা হতে পারে ধূমপান, হতে পারে চকলেট খাওয়া বা মিথ্যা বলা বা গীবত করা। প্রতিজ্ঞা করুন, এবারের রমজানে এই বদভ্যাস থেকে আপনি মুক্ত হবেন। আপনি দেখবেন আপনার জন্য সহজ হয়ে গেছে।
ভোজনবিলাস কমানো: অনেকেই আছেন যারা খুব দ্রুত দেহের ওজন কমিয়ে ফেলতে চান। তবে কিছুদিন খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ না করলেই শরীরের ওজন অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু রমজানে ব্যাপারটা একটু আলাদা। এ সময় খাবার কম কম খাওয়াতে পাকস্থলী সংকুচিত হয়ে যায়। তাই অল্প খাবার খেলেই পেট ভরে যায়। তাই রমজান মাস হচ্ছে সঠিক খাদ্যাভ্যাস শুরু করার একটা ভীষণ ভালো সময়। কাজেই এ ধরনের অভ্যাসের কারণে রমজানের পরেও দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করাটা সহজ হয়।
কোলেস্টেরল কমানো: রমজানে রোজা রাখার মাধ্যমে যে শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো সম্ভব, সেটা প্রায় সবারই জানা। তবে এটা ছাড়াও আরো বেশ কিছু শারীরিক পরিবর্তন ঘটাও অসম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচের একদল কার্ডিওলজিস্ট বলেছেন যে, যারা রমজানে রোজা রাখেন তাদের রক্তে কোলেস্টেরল এর পরিমাণ কমে যায়। ফলে নানা ধরনের হƒদরোগ যেমন হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির ঝুঁকিও কমে যায়। আর যদি রমজানের পরেও সুষম এই খাদ্যাভ্যাস চালু রাখা যায়, তবে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি: রমজানে রোজা রাখার মাধ্যমে দেহ ও মনে নিঃসন্দেহে একধরনের ইতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখেছেন, রমজানে রোজা রাখার মাধ্যমে মস্তিষ্কে নতুন নতুন কোষের জš§ হয়। ফলে মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা বেড়ে যায়। অন্যদিকে কোটিসল নামক একধরনের হরমোন যা আড্রিনালিন গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হয়, তার পরিমাণ কমে যায়। ফলে পুরো রমজান মাসে এবং রমজানের পরেও মানসিক চাপ বেশ কম থাকে।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post