ডা. মনিরুজ্জামান : আশ্চর্য শোনালেও সত্যি, বর্তমানে সারা বিশ্বে মোট মৃত্যুর ৬৩ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। আর বাংলাদেশেও ২০১৬ সালে ৬৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণ ছিল অসংক্রামক রোগ। যেমন হƒদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার প্রভৃতি। এসব রোগের অন্যতম প্রধান কারণ অবৈজ্ঞানিক ও ভুল খাদ্যাভ্যাস।
মানুষ মাংসাশী না তৃণভোজী প্রাণী?
এনথ্রোপলজিস্ট বা নৃ-বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন প্রধানত তৃণভোজী। প্রাণিজ আমিষ অর্থাৎ মাছ মাংস ডিম দুধ খেতে পেলেও তা ছিল অনেক কম। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তারা বলেছেন, মানুষের দাঁতের গঠন মূলত শাকসবজি, ফলমূল ও শস্যদানা খাওয়ার উপযোগী।
এছাড়া মানুষের পরিপাকতন্ত্রের ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র এতটাই দীর্ঘ যে, সেটি আঁশযুক্ত ও উদ্ভিজ্জ খাবারের ধীরে ধীরে হজমপ্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।
গত শতাব্দীর শুরুতেও আমেরিকানরা ছিল অনেকটাই ভেজিটেরিয়ান বা তৃণভোজী। তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার দুই-তৃতীয়াংশ আমিষই ছিল উদ্ভিদজাত। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, পোলট্রি শিল্পের বিকাশ এবং রেফ্রিজারেটরের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে তাদের প্রাণিজ আমিষ খাবারের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমেরিকানদের খাদ্যতালিকার দুই-তৃতীয়াংশ আমিষ আসে প্রাণিজ আমিষ, অর্থাৎ মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ থেকে। ফলাফল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ১৯০০ সালের দিকেও যেসব রোগে আক্রান্তের হার ছিল খুবই কম, সেই রোগগুলোই এখন আমেরিকানদের ঘরে ঘরে; যেমন হƒদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, স্থূলতা, ক্যানসার ইত্যাদি।
বর্তমান বিশ্বের একজন প্রভাবশালী ডায়েট বিশেষজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির নিউট্রিশনাল বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস ও দ্য চায়না স্টাডি গ্রন্থের লেখক ড. টি কলিন ক্যাম্পবেল। দীর্ঘ তিন দশক ধরে নিবিড় গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা ও ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এত উচ্চ রক্তচাপ, হƒদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, স্থূলতা ও ক্যানসারের মূল কারণ মাত্রাতিরিক্ত প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। বিশ্বের বিভিন্ন জনপদের কিছু ঘটনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ড. ক্যাম্পবেলের এই অভিমতকেই সমর্থন করে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সারায়েভো যুদ্ধ চলাকালে সেখানে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ফলে ব্যাহত হয় মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের স্বাভাবিক সরবরাহ এবং সেখানকার অধিবাসীরা দীর্ঘসময় এসব প্রাণিজ আমিষ খাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে তারা রান্না করা খাবারও তেমন খেতে পায়নি। শুধু ফলফলাদি, সবজি-সালাদ, রুটি ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে ছিল তারা। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, যাদের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ছিল, তারা এই রোগগুলো থেকে নিরাময় লাভ করেছে।
পাকিস্তানের উত্তর সীমান্তে হিমালয়ের কোল ঘেঁষে রয়েছে একটি পাহাড়ি জনপদ, যা ‘হুনজা ভ্যালি’ নামে পরিচিত। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই পাহাড়ি অঞ্চলটি আধুনিক সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি উপত্যকা। এখানকার অধিবাসীরা হুনজা নামে পরিচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দীর্ঘজীবনের অধিকারী।
সাধারণ পাকিস্তানিদের গড় আয়ু যেখানে ৬৭ বছর, সেখানে আধুনিক যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হুনজা জনগোষ্ঠীর গড় আয়ু ১০০ বছর। কেউ কেউ এমনকি ১২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে! তারা নিজেদের উৎপাদিত খাবার খায় আর বরফগলা পানিতে গোসল করে এবং সেই পানিই পান করে। কোনো ধরনের প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খায় না। সেই সুযোগই তাদের নেই।
হুনজাদের অন্যতম প্রধান খাদ্য এপ্রিকট। মনে করা হচ্ছে, এপ্রিকটে রয়েছে ভিটামিন বি১৭ (এমিগডালিন), যা তাদের ক্যানসারমুক্ত রেখেছে। তাদের খাদ্যতালিকায় থাকে প্রচুর তাজা ফল, কাঁচা সালাদ, কাঁচা সবুজ পাতা এবং পূর্ণ শস্যদানা, বাদাম, বীজ ও বিন; আর মাংস থাকে খুবই কম।
তাদের দীর্ঘজীবনের নেপথ্যে আরো রয়েছেÑপ্রচুর শারীরিক পরিশ্রম আর বিশুদ্ধ বাতাসে দম নেওয়ার সুযোগ। উচ্চ রক্তচাপ, হƒদরোগ ও ডায়াবেটিস তাদের কাছে অচেনা।
এ ছাড়া পৃথিবীতে পাঁচটি জনপদ আছে, যেখানকার অধিবাসীরা শতবর্ষ বাঁচে এবং তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হƒদরোগ, ডায়াবেটিস প্রায় অনুপস্থিত। এসব জনপদ একত্রে ‘ব্লু জোন্স’ (ইষঁব তড়হবং) নামে পরিচিত। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ, ইতালির সার্ডিনিয়া দ্বীপ, গ্রিসের ইকারিয়া দ্বীপ, কোস্টারিকার নিকোয়া পেনিনসুলা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা।
ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা ছাড়া বাকি চারটি জনপদের মানুষেরা প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত। তাদের খাদ্যতালিকায় চর্বির মাত্রা কম এবং আঁশের পরিমাণ থাকে বেশি। মাছ, ভাত বা রুটি, ডাল অল্প, শাকসবজি, সালাদ, ফল, মটরশুঁটি থাকে পর্যাপ্ত। ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে ব্যস্ত থাকে তারা। জীবনযাত্রার এই ধরনই তাদের এসব রোগ থেকে দূরে রেখেছে এবং দীর্ঘায়ু করেছে। আর ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডার অধিবাসীরা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী একটি বিশেষ গোষ্ঠী। ধর্মীয় কারণেই তারা প্রধানত ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষাশী। প্রাণিজ আমিষ তারা এমনিতেই খায় না।
ওপরের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে এত উচ্চ রক্তচাপ, হƒদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও ক্যানসারের পেছনে প্রধান কারণ অতিরিক্ত প্রাণিজ আমিষ ও মানুষের তৈরি খাবার। খাদ্যশিল্পের ব্যাপক প্রসারের ফলে বিশ্বব্যাপী প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রচলন বাড়ছে।
খাদ্য যখন প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তখন খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থা (ন্যাচারাল স্টেট) বদলে যায়। আবার ওভার কুকিং ও রিফাইনিংয়ের ফলেও খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থা বদলে যায়। দীর্ঘদিন এই জাতীয় খাবার গ্রহণের ফলে শরীরে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে একগুচ্ছ রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়, যা উখঝ (উরড়ীরহ খরশব ঝঁনংঃধহপব) নামে পরিচিত।
দীর্ঘদিন ধরে এই উখঝ জমা হতে হতে একপর্যায়ে তা অফাধহপব ষেুপড়ংুষধঃরড়হ ঊহফ চৎড়ফঁপঃ (অঊে)) নামের এক ধরনের ছাই বা বর্র্জ্য পদার্থে রূপান্তরিত হয়। এই অঊে নামের বর্জ্য শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড (ঘঙ) তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে। উল্লেখ্য, নাইট্রিক অক্সাইড আমাদের শরীরের জন্যে অত্যন্ত দরকারি। এটি ‘মিরাকল মলিক্যুল’ নামে পরিচিত। এই নাইট্রিক অক্সাইড ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও ক্যানহার প্রতিরোধে পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে থাকা চিনি ও সাদা ময়দা খাওয়ার ফলে বাড়ছে স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস। আবার কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের ফলে দেখা দিচ্ছে করোনারি হƒদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিস।
মানুষের সঠিক খাদ্যাভ্যাস: মানুষ সৃষ্টির সেরাÑআশরাফুল মাখলুকাত। তার রয়েছে স্বাধীনতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা। চিন্তার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতাসহ পছন্দমতো খাদ্য গ্রহণেরও স্বাধীনতা।
মানুষ ছাড়া প্রতিটি স্থলচর, জলচর, উভচর ও বায়ুচর প্রাণীর জন্যে রয়েছে নির্দিষ্ট খাদ্যসম্ভার। তারা সেই সীমারেখা কখনোই লঙ্ঘন করে না। বলা যায়, প্রতিটি প্রাণীই সেজন্য নির্ধারিত খাবারেই সন্তুষ্ট এবং তা থেকেই সে লাভ করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং শক্তি। বছরের ৩৬৫ দিনই চতুষ্পদ প্রাণীর মাংস খেয়েও বাঘ বা সিংহের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আবার প্রতিদিন সামান্য ঘাস, খড় বা ভুসি থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে বিশালকায় গরু।
এখন প্রশ্ন হলো, মানুষের খাবারের সীমারেখা কী? যেহেতু স্রষ্টা মানুষকে সহজাত বুদ্ধি-বিবেক দিয়েছেন, দিয়েছেন হারাম-হালালের জ্ঞান, দিয়েছেন কল্যাণ-অকল্যাণের জ্ঞানÑসেজন্যই মানুষকে জানতে হবে কোন খাবার তার জন্য উপকারী, কোনটি ক্ষতিকর, কোনটি পুষ্টিকর আর কোন খাবার দেহকে রোগগ্রস্ত করে তুলবে?
আরও জানতে হবেÑসে কী খাবে, কী খাবে না; কতটুকু খাবে, কখন খাবে এবং কেন খাবে। খাবার স্রষ্টার দেওয়া অমূল্য নেয়ামত। কিন্তু এই নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই খাদ্য সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকেরই প্রাথমিক জ্ঞানটুকু থাকতে হবে।
খাদ্যের উপাদানসমূহ: সব ধরনের খাবারকে বিশ্লেষণ করলে আটটি উপাদান পাওয়া যায়Ñ১. শর্করা (কার্বোহাইড্রেড), ২. আমিষ (প্রোটিন), ৩. চর্বি (ফ্যাট), ৪. ভিটামিন, ৫. মিনারেল, ৬. ফাইটোকেমিক্যাল, ৭. আঁশ (ফাইবার) ও ৮.পানি।
সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য একজন মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এই আটটি উপাদান থাকা অত্যাবশ্যক। আর এজন্য প্রয়োজন সুষম খাবার এবং তা হতে হবে সঠিক পরিমাণে। অধিকাংশ মানুষ পারিবারিক খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে সেটাই শ্রেষ্ঠ খাবার মনে করে খেতে থাকে। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞানসম্মত সুষম খাবারই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ খাবার।
উপরোক্ত আটটি উপাদান যথাযথভাবে পেতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম জানতে হবে রান্নার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে। প্রতিটি প্রাণী তার খাবার গ্রহণ করে থাকে প্রাকৃতিক অবস্থায়। অর্থাৎ যে খাবার প্রকৃতিতে যে রূপে উৎপাদিত হয় বা পাওয়া যায়, সেভাবেই। মানুষ এ-ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যে তার খাবার গ্রহণের আগে কোনো কোনো খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থা বদলে ফেলে। এই বদল কখনো আংশিক, কখনো পুরোপুরি। ফলে সেই খাবারের সবগুলো উপাদান থেকে আমরা আংশিক বা কখনো কখনো সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হই। ফলে আমাদের মধ্যে সেসব উপাদানের স্বল্পতা বা অভাব দেখা দেয়। দিনের পর দিন এটা ঘটতে থাকলে অনিবার্যভাবেই শরীরে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা ও রোগব্যাধি।
খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থা বদলের ঘটনাটি ঘটে মূলত খাবার রান্না করার সময়। তাই রান্নার পদ্ধতিগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post